তিন বছর পরও রহস্য জড়িত মামলা, এএসপি আসিফ আল হাসানের হয়রানি তদন্তে প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন

তিন বছর পরও রহস্য জড়িত মামলা, এএসপি আসিফ আল হাসানের হয়রানি তদন্তে প্রশ্নবিদ্ধ প্রশাসন

নিজস্ব  প্রতিবেদক: রাজশাহীতে ৩৮তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের মেধাবী কর্মকর্তা এএসপি আসিফ আল হাসানকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তার সাবেক স্ত্রী সুবর্ণা সুলতানা সুমীর দায়ের করা একাধিক মামলার মাধ্যমে চরম হয়রানির শিকার করা হয়। দুই বছর পরও মামলাগুলোর প্রকৃত স্বরূপ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানমুখী প্রতিবেদকরা জানিয়েছেন, এসব মামলা কেবল ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে দায়ের হয়নি; এর পেছনে প্রশাসন ও কিছু প্রভাবশালী মহলের সরাসরি জড়িত থাকার ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর বোয়ালিয়া মডেল থানায় তিন বছরের পুরনো কথিত ঘটনার ভিত্তিতে এএসপি আসিফ আল হাসানের নামে একটি মামলা গ্রহণ করা হয়। মামলাটি বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম অভিযোগ গ্রহণ করেন।

সরাসরি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মামলাগুলি পরিকল্পিতভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল, যাতে একজন প্রতিভাবান পুলিশ কর্মকর্তা কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে পড়ে এবং তার উপর মানসিক চাপ তৈরি হয়। এই মামলাগুলি ঢাকার পাশাপাশি রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন ঘটনায় রেকর্ড করা হয়েছিল। এএসপি আসিফ আল হাসানের বাবা এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তার ছেলেকে ভুয়া মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেছেন, সুমীকে ডিএমপির একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে উস্কানি ও সরাসরি সহযোগিতা করছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে তিনি প্রধান উপদেষ্টার কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং ন্যায্য বিচার পাওয়া আশা করা হচ্ছে।

সচেতন মহল মনে করছেন, মামলাগুলোর পেছনে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবও কাজ করেছে। তারা সততা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করেছেন। ওসি রবিউল ইসলাম মামলার বিষয়ে বলেছেন, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। অভিযোগকারী নারী এর আগেও একাধিক মামলা করেছেন, তবে এটি ভিন্ন একটি ঘটনা। মামলাটি মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়ার পরই নথিভুক্ত করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা বর্তমানে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তদন্তে এএসপি আসিফ আল হাসান নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে বলে জানান তিনি।

রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) গাজিউর রহমান জানান, মামলার বিষয়টি খতিয়ে দেখার কাজ চলছে এবং যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। নিরাপরাধ কেউ আসামি হলে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। মামলা হলে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে হবে, আইনের বিধান তা বলে না এবং কেউ সত্যিকার অর্থে জড়িত হলে তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে। আর নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। তিন বছর পরও মামলার সত্যতা, প্রভাব এবং পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। অনুসন্ধানমুখী প্রতিবেদকরা মনে করছেন, এই ধরনের ঘটনা শুধু একজন কর্মকর্তা নয়, পুরো পুলিশ প্রশাসনের সততা ও জনগণের আস্থা পরীক্ষা করছে। দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া ন্যায্য বিচার পাওয়া সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর সুমী নিজেকে এএসপির স্ত্রী পরিচয় দিয়ে পল্লবী থানায় ফারজানা আক্তার নামে এক নারীর বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন। তবে তদন্ত শেষে এসআই মোবারক অভিযোগের কোনো সত্যতা পাননি। বরং তদন্তে উঠে আসে, সুমী নিজেই ওই নারীকে ফোন করেছিলেন এবং ঘটনার পেছনে একটি চক্রের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

দাম্পত্য জীবনে দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক কলহ, বেপরোয়া আচরণ এবং পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের কারণে উভয় পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। ফলে ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর এক পারিবারিক বৈঠকে সুমীর পরিবার ডিভোর্সের প্রস্তাব দেয়। এর পরদিনই সুমী পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে এএসপি আসিফ আল হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করেন এবং পরবর্তীতে একই অভিযোগ পুনরায় জমা দেন। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর এএসপি আসিফ আল হাসান তাকে ডিভোর্স প্রদান করেন। ডিভোর্সের পর সুমী বিভিন্ন সময় তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে পুলিশের চাকরি থেকে বিতাড়িত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এছাড়াও এএসপি আসিফ আল হাসান ও তার পরিবারকে বিভিন্ন ধরণের হুমকি-ধামকি দেন এবং চাঁদা দাবি করেন তিনি।

এ ঘটনায় এএসপি আসিফ আল হাসান ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর শাহজাহানপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ডিভোর্সের প্রায় ৩৫ দিন পর সুমী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১১(ক) ধারায় (যৌতুকের জন্য হত্যা বা হত্যাচেষ্টা) একটি মামলা দায়ের করেন। তবে এএসপি আসিফের পরিবারের দাবি, বিয়ের পর তিনি কখনোই যৌতুক গ্রহণ করেননি; বরং সুমীর বাসাভাড়া ও সংসারের যাবতীয় ব্যয় তিনি নিজেই বহন করতেন। মামলার দিন পুলিশের উপস্থিতিতেই তার ও পরিবারের কেনা প্রায় ১৪ লাখ টাকার মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয় বলেও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।

( এই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। )

Comments are closed.




© All rights reserved © 2024 websitenews24.com