আনোয়ার হোসেন, বিশেষ প্রতিনিধি: দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ, এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোঃ খায়রুল আলম রফিক, একজন চিকিৎসক, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষসহ পাঁচজন সম্মানিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে গত ১৭ মাসে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে মোট ১৫৯টি অভিযোগ দাখিল করা হলেও, পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটের তদন্ত প্রতিবেদনে অধিকাংশ অভিযোগই ভিত্তিহীন, অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, এর আগে দৈনিক প্রতিদিনের কাগজে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে প্রায় ৩৫টি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ, আবেদন এবং মামলার সূত্রপাত ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতা মোঃ শহিদুল ইসলাম, কুড়িগ্রামের বাসিন্দা মির্জা সোবেদ আলী রাজা, মুক্তাগাছার বাসিন্দা মোঃ আনিসুর রহমানসহ একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে একের পর এক অভিযোগ দায়ের করে হয়রানির চেষ্টা করেছে। তদন্তে এসব অভিযোগের অধিকাংশেরই কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
সরকারি কর্মকর্তার দাবি:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা দাবি করেন, একসময় শহিদুল ইসলাম তার কাছে এসে একটি সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে টাকা দাবি করেন।
তার ভাষ্য, “তিনি আমাকে বলেন, পাঁচ লাখ টাকা দিলে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা বন্ধ করে দেবেন। তার কথায় বিশ্বাস করে আমি বিভিন্ন সময়ে প্রায় চার লাখ টাকা দিই। পরে জানতে পারি তিনি প্রতারণার সঙ্গে জড়িত। কাওরান বাজারে তাদের কথিত পত্রিকা অফিসে গিয়ে দেখি অফিস বন্ধ। পরে বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি, তিনি ও তার সহযোগীরা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ:
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা মামুন অভিযোগ করেন, ব্যবসায়িক বিনিয়োগের কথা বলে শহিদুল ইসলাম ও মির্জা সোবেদ আলী রাজা তার কাছ থেকে প্রায় এক কোটি টাকা নেন। বিনিময়ে দেওয়া চেক পরবর্তীতে কার্যকর হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে পটুয়াখালীর এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, রাজা ও শহিদুল ইসলাম তার কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা নেন এবং মির্জা সোবেদ আলী রাজার স্ত্রী রোজিনা আক্তারের নামে একটি চেক দেন, যা পরবর্তীতে কার্যকর হয়নি। বর্তমানে অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগও সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি জানান।
আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন:
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, একটি মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে পরিচালিত গোপনীয় অনুসন্ধানে অভিযুক্ত পাঁচজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জালিয়াতিমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য উঠে আসে। তদন্ত শেষে গত ১৮ ও ২০ জুলাই সংশ্লিষ্ট আদালতে একটি গোপনীয় পুলিশ প্রতিবেদন এবং একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত চক্রটি শুধু সাংবাদিক মোঃ খায়রুল আলম রফিকের বিরুদ্ধেই নয়, বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধেও ধারাবাহিকভাবে অভিযোগ দিয়ে হয়রানির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। তদন্তে এসব অভিযোগের অধিকাংশের কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানহানি মামলা বিচারাধীন:
এ ঘটনায় অভিযুক্ত পাঁচজনের বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগে মামলা নং-৩৪৯/২০২৬ দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে অভিযোগে বর্ণিত ঘটনার প্রেক্ষিতে দণ্ডবিধির ৫০০, ৫০১ ও ৫০২ ধারার অপরাধের উপাদান পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে ময়মনসিংহের সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
আরও ভুক্তভোগীর বক্তব্য:
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার চিকিৎসক ডা. মহাসিন ফকির দাবি করেন, শহিদুল ইসলাম দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আসছেন। এ ঘটনায় তিনি সাইবার অপরাধ আইনে দুটি মামলা করেছেন। তার ভাষ্য, একটি মামলায় পুলিশ শহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করলে তিনি প্রায় চার মাস কারাগারে ছিলেন।
ভাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা রফিকুজ্জামান অভিযোগ করেন, শহিদুল ইসলাম বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ করে হয়রানির পরিবেশ সৃষ্টি করেন। তার বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ করা হলেও তদন্তে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবি করেন। ভাঙ্গা ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ মৃধা বলেন, শহিদুল ইসলাম বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অযথা অভিযোগ ও মামলা করে বিরোধ সৃষ্টি করেন। তার দাবি, ভাঙ্গা উপজেলার অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীও তার কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ। তিনি আরও বলেন, শহিদুল ইসলাম নিজেকে হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিলেও খোঁজ নিয়ে তিনি এ তথ্যের সত্যতা পাননি। ভাঙ্গা উপজেলার সাংবাদিক শামিম বলেন, “শহিদুল ইসলাম একজন প্রতারক। তার কাছ থেকে সবাই দূরে থাকাই ভালো।”
দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর সম্পাদক মোঃ খায়রুল আলম রফিক বলেন, “শহিদুল ইসলামের মতো একজন ব্যক্তিকে আমি গুরুত্ব দিই না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও বিরোধ সৃষ্টি করে আসছেন। তার আনা সব অভিযোগের আইনগতভাবে মোকাবিলা করব। আদালতের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।” অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য জানতে শহিদুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।