নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যা মামলার ৫ নম্বর আসামি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এখন পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে একজন নাগরিককে হত্যার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তার নাম থাকলেও তিনি নির্ধারিত বিচার প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে পুলিশের উচ্চপদে পদোন্নতি পেয়েছেন। শুধু পেশাগত বিতর্ক নয়, ব্যক্তিজীবনেও রয়েছে নানা কেলেঙ্কারির অভিযোগ। মাগুরা জেলা পুলিশ সুপার থাকাকালীন তিনি অধীনস্থ এক ওসির স্ত্রীকে বিয়ে করেন। এর আগে তালাক দেন তার প্রথম স্ত্রী ফাহিমা আক্তারকে, তিনি দাবি করেছেন—তালাকের পরও তাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করে চলেছেন জহিরুল। মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বর্তমানে ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে পুলিশ সুপার (অপারেশনস) পদে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। গত ২৫ এপ্রিল সাবেক স্ত্রী ফাহিমা আক্তার পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আইজিপির কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। কিন্তু প্রায় তিন মাস অতিক্রম করলেও কোনো বিচার না পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি। এদিকে গত বছরের ২০ জুলাই ঢাকার ভাটারা থানাধীন কুড়িল এলাকায় ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার আন্দোলনে গুলি ও পিটিয়ে নিহত হন জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তি।
সেই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার ৫ নম্বর আসামি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম। ভাটারা থানার ওসি রাকিবুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ভাটারা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার বাদী শফিকুল ইসলাম ঢাকা উত্তর জেলার হারবাইন এলাকার নজরুল ইসলামের ছেলে এবং নিহত জাহাঙ্গীর পাবনার সদর উপজেলার বাসিন্দা। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সহিংস হামলা চালায় ফ্যাসিবাদী চরিত্রের একটি গোষ্ঠী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ছাত্রদের লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র, হকিস্টিক, চাইনিজ কুড়াল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট, ককটেল, বোমাসহ নানা প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এ দিন হামলায় জাহাঙ্গীরের সর্বাঙ্গে আঘাত লাগে। এতে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তখন চিকিৎসার জন্য বাদী হাসপাতালে নিতে চাইলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ জহিরুল ইসলাম জাহাঙ্গীরকে পুড়িয়ে মারতে চান। তখন আন্দোলনকারীরা তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে লুকিয়ে রাখে। তার অবস্থার অবনতি হলে পরদিন ২১ জুলাই আগারগাঁও নিউরোসাইন্স হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিকাল সাড়ে ৩ টার দিকে জাহাঙ্গীর মারা যান। অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের সাবেক স্ত্রী ফাহিমা আক্তার বলেন, ‘১৯৯৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর আমরা ছাত্র অবস্থায় বিয়ে করি। ৬ মাস পর আমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি পাই এবং আমার আয় দিয়েই সংসার ও ওর লেখাপড়ার খরচ চলত। ২০০৩ সালে ও রাইফেলস স্কুলে শিক্ষকতা করছিল। তখন এক ছাত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে।
আমি তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। বিষয়টি জানার পর ও ক্ষমা চায় এবং আবার সংসার শুরু করি। পরে ও ২৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে পুলিশে যোগ দেয়।’ তিনি বলেন, ‘মাগুরা জেলার এসপি হওয়ার পর থেকেই ওর আচরণ পাল্টে যায়। আমার ওপর নির্যাতন বাড়ে। আমি নিজেই বলতাম, ‘তুমি চাও আমি ছেড়ে দেব, কিন্তু আর অত্যাচার করো না। পরবর্তীতে জানতে পারি, তার নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে। পরিবারের সবাইকে বললেও কেউ কিছু বলে না। এক পর্যায়ে সে ফিরে এসে সাহায্য চায়। আমি আবারও ভেবে নিই, হয়তো এবার ঠিক হবে।’ ফাহিমা আক্তার বলেন, ‘আমরা নিউ মার্কেট অফিসার্স কোয়ার্টারে উঠি। কিন্তু আড়াই মাসের মাথায় সে আবার উত্তরায় বাসা নেয়। ঝগড়া করে আমার অনুপস্থিতিতে সব জিনিসপত্র নিয়ে যায়। ওর পরকীয়ার বিষয় জানিয়ে ইন্সপেক্টর জব্বারের স্ত্রী সোনিয়া ইভানা তার সঙ্গে দেখা করেন। তারা দুজনই এক মহিলার সঙ্গে সম্পর্কে ছিল। সেই মহিলা রিয়া জোয়াদার, মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার মহিলা আওয়ামী লীগের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন।’ তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে তখনকার আইজিপি বেনজীর আহমেদের হস্তক্ষেপে তাকে বদলি করা হয়। এরপর জানতে পারি, সে সোনিয়া ইভানাকেও বিয়ে করেছে।
সোনিয়া ছিল ইন্সপেক্টর জব্বারের স্ত্রী। আমি কিছু বলিনি, শুধু চেয়েছি আমার সন্তানদের জন্য একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থা হোক। জহির সোনিয়ার মাধ্যমে আমাকে হুমকি দিত। বলে, সোনিয়ার অনেক ক্ষমতা আছে। এক সময় আমাকে পুলিশি হয়রানির হুমকিও দেয়।’ ফাহিমা আক্তার আরও বলেন, ‘২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি আশরাফুর রহমান ও দুইজন অতিরিক্ত ডিআইজির উপস্থিতিতে সে মাসিক ১৫ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ছোট ছেলের পড়াশোনার জন্য। কিন্তু এপ্রিল থেকেই টাকা বন্ধ করে দেয়। আমি আইজিপির কাছে বিচার চেয়েছি। কিন্তু সে বিভিন্ন মাধ্যমে আমাকে হুমকি দিচ্ছে। চাকরি থেকে বের করে দেওয়ারও ষড়যন্ত্র করেছে। থানায় জিডি করেছে, আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে।’ এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের ফোনে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজি মোহাম্মদ আতাউল কিবরিয়ার ফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি সাড়া দেননি। ইন্সপেক্টর জব্বারের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তিনি সংবাদকর্মীর পরিচয় পেয়ে কল কেটে দেন এবং পরে আর রিসিভ করেননি।